উপনয়নঃ- শব্দের অর্থ কী আজ জানবো।

উপনয়নঃ- নিকটে যাওয়া।উপ= নিকটে,নয়ন=চোখ।অর্থাৎ বিশেষ প্রকার সংস্কার করবার পর ছাএছাএীদের বিদ্যা শিক্ষার জন্য গুরুর নিকটে যাওয়া তার নাম উপনয়ন/যজ্ঞপবীত।


উপবিদ প্রকৃতপক্ষে তিনটি পবিত্র সূত্র যা দেবী সরস্বতী গায়ত্রী ও সাবিত্রির প্রতীক। আর এই তিন জনই নারী।
উপবীতধারনকালে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতে হয়। অথচ কিছু ব্যক্তি বলেন মেয়েদের গায়ত্রী মন্ত্র জপ করা নিষেধ। 🤫

কলিযুগে মেয়েদের নাকি পৈতা/যজ্ঞপবীত ধারন করা বারন,কেউ এই প্রথা ভাঙলে তাকে হাসির পাএ হতে হয়।সমাজ ছিঃ ছিঃ করে।
মেয়েরা কি আদেও পারেন যজ্ঞপবীত ধারন করতে???

তথ্যসূএঃ-

স্মৃতিচন্ডিকা স্মৃতিকার হারিত উল্লেখ করেছেন-

“দ্বিবিধা স্ত্রীমো ব্রহ্মবাদিনাঃ সদ্যঃবদ্ধশ্চ তত্র তত্র ব্রহ্মবাদিনীনাম্ অগ্নিণ্বধনম্
বেদাধ্যয়ম স্বগৃহে চ ভিক্ষাচর্যা ইতি।

পুরাকালে কুমারীদের উপনয়নসংস্কার বা মৌঞ্জি-বন্ধন করা হতো, তাদের বেদ পাঠ শিক্ষা দেওয়ার বিধান ছিল, এবং গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণের পদ্ধতি শেখালো হতো, কুমারীদের রজস্বলা হবার পূর্বে গুরু গৃহ হতে সমাবর্তনও হতো।

সপ্তম শতকে মহাকবি বানভট্ট দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন কাদম্বরী ও হর্ষচরিত;

কাদম্বরী গ্রন্থে কাদম্বরীর উল্লেখ্য চরিত্র হল মহাশ্বেতা। মহাশ্বেতার বর্ননায় দেখা যায় তিনি যখন তপস্যায়রতা, তখন ব্রহ্মসূত্র বা যজ্ঞ উপবীত ধারণ করায় তাঁর শরীর পবিত্র হয়ে উঠেছিল। হর্ষচরিতে সরস্বতী সম্বন্ধে একইভাবে বলা আছে তাঁর

কাঁধ থেকে লম্বমান যে যজ্ঞ উপবীত, তার দ্বারা সরস্বতীর দেহ পবিত্র হযে উঠেছিল।

(ঋগ্বেদ ১০.০৫.৪১) মন্ত্রে বিবাহ সংস্কারে স্পষ্ট বলা হয়েছে পতির সামনে যজ্ঞ উপবীত ধারিণী কন্যা। বৈদিক যুগে নারীদের পবিত্র ব্রহ্মউপবীত দ্বারা দীক্ষিত করা হতো, অর্থাৎ নারীদের উপনয়ন সংস্কার প্রচলিত ছিল।

যজুর্বেদে বলা হয়েছে- “তদেতৎ সর্বমাপ্নোতি যজ্ঞে শ্রোত্রামণি সুতে (যজুর্বেদ ১৯.৩১), অর্থাৎ- গ্রন্থিযুক্ত যজ্ঞোপবীত সূত্র ধারণ করে যজ্ঞ করলে যজ্ঞের সম্পূর্ণ ফল পাওয়া যায়।( মনুস্মৃতি)
যজ্ঞোপবীত /পৈতার এক একটি সূএে এক একজন দেবতা আছেন। ১ম তন্তুতে ওঁকার, ২য় তন্তুতে অগ্নি,৩ৃতীয় তন্তুতে অনন্তনাগ,চতুর্থ তন্তুতে- চন্দ্র, ৫ম তন্তুতে পিতৃগন,৬ষ্ঠ তন্তুতে প্রজাপতি, ৭ম তন্তুতে বসুগন,৮ম তন্তুতে যক্ষ,
৯ম তন্তুতে শংকর।

এই যজ্ঞোপবীতের/পৈতার উৎপত্তি সম্বন্ধে গৃহ্যাসংগ্রহে বর্ণিত আছে।

“ব্রহ্মেণোৎপাদিতং সূত্রং বিষ্ণুনা ত্রিগুণীকৃতম।

রুদ্রেণ তু কৃতো গ্রন্থিঃ সাবিত্রায়াচাভিমন্ত্রিতম্.”

অর্থাৎ ব্রহ্মা সূত্র প্রস্তুত করেন, বিষ্ণু ৩ দণ্ডী করেন, রুদ্র গ্রন্থি দেন ও সাবিত্রী মন্ত্র পূত করেন।

মনুষ্যদেহ ৯ দ্বার যুক্ত ২ চোখ, ২ কান, ২ নাক, মুখ, লিঙ্গ ও পায়ু এই ৯ দ্বার দিয়েই আমাদের শরীরে পাপ প্রবেশ করে। এই নবদ্বার বন্ধ করার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি স্বরূপ ৯ টি তক্ত সমৃদ্ধ যজ্ঞোপবীত বা পৈতা।

যজ্ঞোপবীত বা প্রতিটি পৈতা তিনটি আলাদা সূত্রকে গিঁট বা গ্রন্থি দিয়ে তৈরী। এই গিট বা বন্ধনকে ব্রহ্মগ্রন্থি বা ঈশ্বর কর্তৃক প্রদত্ত গ্রন্থি বলা হয়। এর তিনটি সূত্র ঈশ্বর কর্তৃক নির্দেশিত প্রতিটি মানুষের তিনটি ব্রত বা ঋণ বা দায়িত্বের প্রতীক। কি সেই তিনটি ঋণ যা প্রত্যেকটি মানুষকে শোধ করতে হয়। সেগুলো হলো দেবঋণ, পিতৃঋণ ও ঋষিঋণ।

১) দেবঋণ- ঈশ্বর কর্তৃক প্রদত্ত আমাদের বেঁচে থাকার অপরিহার্য এ পৃথিবী, পরিবেশ ও প্রানীকুলের প্রতি দায়িত্ব। পৃথিবীকে সুন্দর করে গড়ে তোলা, পরিবেশ শুদ্ধ করা ও জীবে সেবা করা দেবঋণের অন্তর্গত।

২) পিতৃঋণ- পিতামাতার প্রতি ঋণ। নিঃস্বার্থভাবে এই দুই জীবন্ত দেবতা আমাদের লালন পালন করে উপযুক্ত করে তোলেন। তাদের যথাসাধ্য সেবাযত্ন করা আমাদের পারিবারিক কর্তব্য।

৩) ঋষিঋণ- প্রাচীন বৈদিক ঋষিগণ থেকে শুরু করে নিজের গুরু-শিক্ষক, এরাই আমাদের প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলেন। এদের সেবা, অনুস্মরণ করাই ঋষিঋণ।

উপনয়নের পঞ্চগিট—- যজ্ঞোপবীত বা পৈতাতে মোট পাঁচটি গিঁট থাকে। এই পাঁচটি গিট উপরোক্ত ঋণসমূহ পরিশোধে পাঁচটি বাঁধার কথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়-কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, মোহ। অবস্থান- যজ্ঞোপবীত বাঁম কাধ থেকে ঝুলিয়ে ডান দিকের কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। সূত্রটি ঠিক হৃদপিন্ডের উপর দিয়ে যায় যার মাধ্যমে প্রতীকিভাবে বোঝানো হয় নিজের দায়িত্বগুলো হৃদয় থেকে পালন করতে।

যজ্ঞোপবীত বা পৈতার অপরনাম প্রতিজ্ঞাসূত্র বা রক্তসূত্র। আটবছর থেকে বার বছর বয়সের ভেতর প্রতিটি বৈদিক ধর্মালম্বীর উপনয়ন আবশ্যক এবং উপনয়নের মাধ্যমে এই পবিত্র সূত্রটি সে গুরুকর্তৃক প্রাপ্ত হয়।

আচার্য ব্রহ্মচারীকে উপনয়ন সংস্কারের পরে নিজের সাহচর্যে রাখতেন

শ্রী রামচন্দ্র ভগবানের মাতা কৌশল্যাদেবীও একজন এই যজ্ঞোপবীত ধারনকারী মন্ত্র দ্রষ্টা নারী ছিলেন।।

আসুন এবার তবে জানি এই গায়এী মন্ত্রটা কি???

২/তথ্য সূত্র ঃ-

য়া দম্পতী সমনসা সুনুত আ চ ধাবতঃ।

দেবাসো নিত্যয়াহশিরা। (ঋগ্বেদ ৮/৩১/৫)

বঙ্গানুবাদঃ হে বিদ্ধানগণ! যে পত্নী ও পতি এক সঙ্গে একমনে যজ্ঞ করে, উপাসনা দ্বারা যাহাদের মন পরমাত্মার দিকে ধাবমান হয় তাহারা নিত্য পরমাত্মার আশ্রয়েই সব কার্য করে।

এছাড়া বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি ও ব্রহ্মজিজ্ঞাসুর মধ্যে কিছু শ্রদ্ধেয় নারী ঋষির (ব্রহ্মবাদিনী) নাম-

১) ঘোষা (ঋষি কক্ষিবান এর কন্যা, ঋগ্বেদ দশম মন্ডলের ৩৯-৪১ নং সুক্তের দ্রষ্টা)

২) অপালা (ঋষি অত্রি এর কন্যা, ঋগ্বেদ ৮/৯১/১ এর ঋষি)

৩) ইন্দ্রানী (ইন্দ্রের পত্নী, ঋগ্বেদ ১০/১৪৫/১-৬ এর ঋষি)

৪) অম্ভৃনী(মহর্ষি অম্ভৃন এর কন্যা, ঋগ্বেদের অষ্টম মন্ডলের ১২৫ নং সুক্তের দ্রষ্টা)

৫) বাক (ঋগ্বেদের বিখ্যাত দেবীসুক্তের দ্রষ্টা ঋষি) এছাড়াও রয়েছেন:

৬) রাত্রি (মহর্ষি ভরদ্বাজের কন্যা)

৭) বিশ্ববারা (ঋগ্বেদের পঞ্চম মণ্ডলের অষ্টবিংশ সূক্তের ঋষিকা
এসকল ঋষিকাদের উদ্ধৃতি থেকে প্রমান পেলাম যে মেয়েরা যজ্ঞপবীত/পৈতা ধারনের অধিকারী ছিলেন,এবং পূজার্চ্চনা,হোম করতেন।
আমরা অম্ভৃনী নারীগনও তাই এই সকল ঋষিকাদের সম্মান জানিয়ে তাঁদের দেখানো পথে পুনরায় হাটার প্রয়াস ও চেষ্টা করে চলেছি।
আমরা পৈতা দিলাম কৃষ্ণনগর উকিলপাড়া নিবাসী এবং কৃষ্ণনগর কোর্টের আইনজীবী অরূপ রতন চ্যাট্টাজ্জীর কন্যাকে পৈতা ধারনের সংস্কারের কাজে ব্রতী হয়েছিলাম।

বৈদিক যুগে জানি সব পুরুষ ও নারী উভয়ে শিক্ষা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব পেতেন। এবং বেদ অধ্যায়ন করতে গেলে যজ্ঞপবিত ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই গ্রহণ করতে হতো। তবেই ব্রহ্মচর্য পালন করতে পারতেন। এবং ব্রহ্মবাদীনি নারীদের সকলের
যজ্ঞপবিত ছিলো।এটা কোনো নতুন বিষয় নয়, বৈদিক যুগ থেকেই আসছে মেয়েদের পৈতে দেওয়ার রীতি। আমরাই পড়াশোনা করি না এবং জানার চেষ্টাও করি না তাই এসব শুনলেই আমরা ভাবি যে নতুন বুঝি।সীতা দেবীর ও যজ্ঞপবিত ছিলো.এবং সৃজা চ্যাটার্জি ও তার পরিবার নিজে থেকেই পৈতে গ্রহন করার এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।